কয়েকশো মিলিয়ন বছর ধরে উদ্ভিদ অত্যন্ত জটিল একটি কাজ করে আসছে। পাতাগুলি সূর্যের আলো ধরে তার শক্তিকে রাসায়নিক শক্তিতে বদলে দেয়, যা সঞ্চয় করে পরে ব্যবহার করা যায়।

এই প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে ইউরোপের একদল গবেষক প্রায় 4 বছর ধরে এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করেছেন, যা সূর্যের আলো ব্যবহার করে জলকে ভেঙে সবুজ হাইড্রোজেন তৈরি করে। সেটি সঞ্চয় করে পরে শক্তির উৎস হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

এই গবেষণার নেতৃত্ব দেওয়া আয়ারল্যান্ডের ইউনিভার্সিটি কলেজ কর্কের জ্যেষ্ঠ বিজ্ঞানী ড. আইলবে ও মানাখাইনের কাজটি শুরু হয়েছিল আপাতদৃষ্টিতে সহজ একটি প্রশ্ন দিয়ে: একটি মাত্র, পুনর্ব্যবহারযোগ্য, কার্বনমুক্ত বহু-সেল ব্যবস্থার মাধ্যমে সূর্যের আলোকে কি সরাসরি সবুজ হাইড্রোজেনে বদলানো সম্ভব?

EU-এর অর্থায়নে পরিচালিত FreeHydroCells প্রকল্পের মাধ্যমে এই কাজ করা হয়েছে। এতে আয়ারল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ও ইতালির গবেষকেরা একসঙ্গে কাজ করেছেন।

তিনি বলেন, “পাতা যেভাবে সূর্যের আলো ধরে, তা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আমরা পরিচ্ছন্ন শক্তি তৈরির আরও কার্যকর ও সাশ্রয়ী উপায় উদ্ভাবন করতে চেয়েছিলাম।”

সূর্যের আলো থেকে হাইড্রোজেন

জীবাশ্ম জ্বালানি থেকে সরে আসার পথে ইউরোপে হাইড্রোজেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে আশা করা হচ্ছে।

তবে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহার করে হাইড্রোজেন তৈরি করা সহজ নয়। তথাকথিত সবুজ হাইড্রোজেন তৈরির প্রচলিত পদ্ধতিতে নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ দিয়ে একটি ইলেকট্রোলাইজার চালানো হয়। সেটি জলকে ভেঙে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন তৈরি করে। এর জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন এবং জল ভাঙার আলাদা ব্যবস্থা প্রয়োজন।

“পাতা যেভাবে সূর্যের আলো ধরে, তা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে আমরা পরিচ্ছন্ন শক্তি তৈরির আরও কার্যকর ও সাশ্রয়ী উপায় উদ্ভাবন করতে চেয়েছিলাম।” — আইলবে ও মানাখাইন, FreeHydroCells

FreeHydroCells-এর গবেষকেরা আরও সমন্বিত একটি পদ্ধতি খতিয়ে দেখেছেন, যেখানে ওই কাজগুলি একই ব্যবস্থায় করা হয়। তখনও বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকা নতুন সেমিকন্ডাক্টর উপাদান দিয়ে কাজ শুরু করে তাঁরা এমন একটি সম্পূর্ণ ব্যবস্থা তৈরির উদ্যোগ নেন, যা জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভর না করে সূর্যের আলো ব্যবহার করে জলকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে ভাঙতে পারে।

এটি করতে তাঁরা প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায় এবং টেকসই—এমন উপাদান ব্যবহার করে কার্যকারিতা, সাশ্রয়ী দাম ও স্থায়িত্ব একসঙ্গে আনতে চেয়েছিলেন। তাঁরা এটাও দেখাতে চেয়েছিলেন যে প্রযুক্তিটির আকার বাড়ানো সম্ভব—ছোট সেল থেকে বড় সেলে যাওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সেগুলিকে একটি সচল বহু-সেল ব্যবস্থায় যুক্ত করা যায়।

পাতার মতো প্রক্রিয়া

গবেষকেরা তাঁদের প্রযুক্তিকে সালোকসংশ্লেষের কৃত্রিম অনুকরণ না বলে ‘পাতার মতো’ বলে বর্ণনা করেন। একটি প্রাকৃতিক পাতা সূর্যের আলো, জল ও CO 2 ব্যবহার করে এমন জৈব পদার্থ তৈরি করে, যার মধ্যে শক্তি সঞ্চিত থাকে। অন্যদিকে, FreeHydroCells ব্যবস্থা সূর্যের আলো দিয়ে এমন একটি কার্বনমুক্ত প্রক্রিয়া চালায়, যা জলকে হাইড্রোজেন ও অক্সিজেনে ভেঙে দেয়।

জার্মানির আখেনে অবস্থিত ন্যানোটেকনোলজি গবেষণা সংস্থা AMO-তে সেন্সর প্রযুক্তি ও শক্তি রূপান্তরবিষয়ক গবেষকদলের প্রধান ড. উলরিশ প্লাখেটকা বলেন, “শেষ পর্যন্ত একটি পাতাও তো সৌরশক্তিতে চলা জৈব-রাসায়নিক কারখানা।”

এই ব্যবস্থার মূল অংশে রয়েছে সূর্যের আলো শোষণের জন্য তৈরি সেমিকন্ডাক্টর উপাদানের পাতলা স্তর। যথেষ্ট আলোকশক্তি শোষিত হলে তা বৈদ্যুতিক চার্জ তৈরি করে। সেই চার্জ জল যেখানে উপাদানের সংস্পর্শে আসে সেখানে পৌঁছে দেওয়া যায়, ফলে জলের অণু ভাঙার প্রয়োজনীয় শক্তি পাওয়া যায়।

অর্থাৎ একই সামগ্রিক ব্যবস্থার মধ্যে সূর্যের আলো ধরে সেটিকে হাইড্রোজেনের আকারে রাসায়নিক শক্তিতে বদলে দেওয়া হয়।

একটি সেল থেকে পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থা

ধারণাটি একেবারে নতুন নয়। 5 দশকেরও বেশি সময় ধরে ফোটোইলেকট্রোকেমিক্যাল সেল নিয়ে গবেষণা চলছে। কিন্তু এই ধারণাকে ব্যবহারিক প্রযুক্তিতে রূপ দেওয়া অনেক বড় চ্যালেঞ্জ।

গবেষকদের সেমিকন্ডাক্টর উপাদান, ন্যানোটেকনোলজি, জল ভাঙা এবং শক্তি রূপান্তরসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের দক্ষতা একত্র করতে হয়েছে। তাঁদের কিছু মৌলিক ব্যবহারিক প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হয়েছে। প্রযুক্তিটি কি আরও বড় জায়গাজুড়ে কাজ করতে পারবে? বিভিন্ন অংশ কি একসঙ্গে যুক্ত করা যাবে? আর উৎপাদনের উপযোগী প্রক্রিয়ায় কি সেই ব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব?

কয়েক বছর ধরে দলটি সদ্য উদ্ভাবিত সেমিকন্ডাক্টর উপাদান ও ছোট পরীক্ষাগার-সেল থেকে ধাপে ধাপে বড় এলাকার বহুস্তরীয় সেল এবং শেষ পর্যন্ত বহু-সেলযুক্ত জল ভাঙার ব্যবস্থা তৈরি করেছে।

সম্পূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে এই সাফল্য প্রকল্পের ফলাফলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। শুধু একটি সচল সেল দেখানোর বদলে গবেষকেরা একাধিক অংশকে বড় একটি ব্যবস্থায় যুক্ত করেছেন, যার নকশায় ভবিষ্যতে উৎপাদনের বিষয়টিও মাথায় রাখা হয়েছে।

কৃত্রিম সূর্যালোকে পরীক্ষায় সৌরশক্তি থেকে হাইড্রোজেন তৈরির কার্যকারিতা প্রায় 18–21% পাওয়া গেছে। সরাসরি সৌরশক্তিতে জল ভাঙার ব্যবস্থার পক্ষে এটি ভালো ফল। প্রচলিত ইলেকট্রোলাইজারে প্রথমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হয়, তারপর সেই বিদ্যুৎ দিয়ে জল ভাঙা হয়। কিন্তু এই ব্যবস্থা বাইরে থেকে বৈদ্যুতিক ভোল্টেজ না দিয়েই সরাসরি ধরে রাখা সূর্যালোক ব্যবহার করে চলেছে।

প্রযুক্তিটি এখনও প্রযুক্তিগত প্রস্তুতির স্তর 4-এ (TRL 4) রয়েছে। অর্থাৎ এটি পরীক্ষার প্রাথমিক পর্যায়ে এবং বাণিজ্যিক ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত পণ্য নয়। তবে গবেষকদের কাছে বড় এলাকাজুড়ে বিভিন্ন অংশ একসঙ্গে কাজ করতে পারে—এটি দেখানো ছিল গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

পরিচ্ছন্ন হাইড্রোজেনকে আরও সহজলভ্য করা

তবে গবেষকদলের কাছে শুধু কার্যকারিতাই যথেষ্ট নয়। সবুজ হাইড্রোজেনকে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহারিক বিকল্প হতে হলে সেটি সাশ্রয়ী ও টেকসই হতে হবে, পাশাপাশি দুষ্প্রাপ্য উপাদানের উপর নির্ভরতা এড়াতে হবে। FreeHydroCells ব্যবস্থায় পাতলা ফিল্ম প্রযুক্তির পাশাপাশি প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়, টেকসই এবং সম্ভাব্যভাবে পুনর্ব্যবহারযোগ্য—এমন উপাদান ব্যবহার করা হয়।

গবেষকেরা বড় এলাকার জন্য হালকা যন্ত্রাংশ তৈরি করেছেন, যেগুলিকে ভবিষ্যতে জুড়ে মডিউলার ব্যবস্থা বানানো যেতে পারে। এটি শক্তি উৎপাদন ও সঞ্চয়ের অন্য এক পথের ইঙ্গিত দেয়। পুরোপুরি বড় ও কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার উপর নির্ভর না করে যেখানে প্রয়োজন, তার কাছাকাছিই হাইড্রোজেন উৎপাদন করা সম্ভব হতে পারে।

“শেষ পর্যন্ত একটি পাতাও তো সৌরশক্তিতে চলা জৈব-রাসায়নিক কারখানা।” — উলরিশ প্লাখেটকা, FreeHydroCells

দীর্ঘ মেয়াদে গবেষকেরা এমন বিকেন্দ্রীভূত শক্তি ব্যবস্থার কথা ভাবছেন, যার সাহায্যে বাড়ি, ব্যবসা ও স্থানীয় জনসমাজ নিজেদের নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন ও সঞ্চয় করতে পারবে। ছোট বায়ুশক্তি বা জলবিদ্যুৎ ব্যবস্থা সৌরশক্তির অংশটির পরিপূরক হতে পারে। সূর্যের আলো না থাকলে এগুলি শক্তি সঞ্চয়ে সহায়তা করতে পারে।

এ ধরনের ব্যবস্থা জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমাতে পারে। বড় আকারে চালু করা গেলে ব্যয়বহুল পরিকাঠামোর মাধ্যমে অনেক দূরে শক্তি পাঠানোর প্রয়োজন কমিয়ে বর্তমান শক্তি নেটওয়ার্কের চাপও কমাতে পারে। শক্তির প্রাপ্যতা, উৎপাদন, সঞ্চয় ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে এটি স্থানীয় জনসমাজকে আরও প্রতিকূলতা-সহনশীল করে তুলতে পারে।

তবে আপাতত এটি পরীক্ষিত প্রয়োগ নয়, ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনা মাত্র।

পরীক্ষাগার থেকে জনসমাজে

তাৎক্ষণিক চ্যালেঞ্জ হল প্রযুক্তিটিকে পরীক্ষাগারে ধারণার বর্তমান প্রমাণের স্তর পেরিয়ে আরও বাস্তবসম্মত পরিবেশে পরীক্ষা করা।

গবেষকদের পরবর্তী লক্ষ্য হল TRL 5-এর দিকে এগোনো এবং আরও প্রাসঙ্গিক পরিবেশে প্রযুক্তিটি দেখানো। এর জন্য ব্যবস্থাটিকে আরও বড় এলাকাজুড়ে প্রয়োগ করতে হবে। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে, এটি দক্ষতার সঙ্গে উৎপাদন করা এবং শেষ পর্যন্ত বাজারে আনা সম্ভব।

ও মানাখাইন বলেন, “হালকা ওজনের পূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থার স্তরে আমরা এটি করতে পেরেছি। আর এর গুরুত্ব যতই বলি, কম বলা হবে।”

পরীক্ষাগারে ধারণার প্রমাণ থেকে বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহৃত সবুজ হাইড্রোজেন প্রযুক্তি হয়ে ওঠার পথ এখনও অনেক দীর্ঘ। তবে গবেষকেরা ইতিমধ্যেই ধারণাটিকে প্রযুক্তি বাস্তবায়নের পর্যায় থেকে অনেকটা এগিয়ে নিয়ে গেছেন।

তাঁদের কৃত্রিম পাতা প্রকৃতিকে নিখুঁতভাবে অনুকরণ করে না। বরং এটি প্রকৃতির সবচেয়ে পুরোনো কৌশলগুলির একটি—সূর্যের আলো ধরে সেটিকে সঞ্চিত রাসায়নিক শক্তিতে রূপান্তর—থেকে ধারণা নেয় এবং সেই নীতিকে আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর ও উৎপাদন প্রযুক্তির সঙ্গে যুক্ত করে।

এই পদ্ধতিকে যথেষ্ট টেকসই, সাশ্রয়ী এবং বড় আকারে প্রয়োগযোগ্য করে তোলা গেলে ভবিষ্যতে এটি আরও সরাসরি এবং সম্ভাব্যভাবে কম প্রভাব ফেলে সবুজ হাইড্রোজেন উৎপাদনের উপায় দিতে পারে।

এটি মানুষের বসবাস ও কাজের জায়গার কাছাকাছি নবায়নযোগ্য শক্তি উৎপাদন ও সঞ্চয়ে সহায়তা করতে পারে। এর ফলে স্থানীয় জনসমাজ নিজেদের শক্তি কীভাবে উৎপাদিত, সঞ্চিত ও ব্যবহৃত হবে, তার উপর আরও বেশি নিয়ন্ত্রণ পেতে পারে। পাশাপাশি তাদের কার্বন নিঃসরণ, জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা এবং বর্তমান শক্তি নেটওয়ার্কের উপর চাপ কমতে পারে।

এই নিবন্ধে উল্লিখিত গবেষণায় EU-এর Horizon Programme অর্থায়ন করেছে। সাক্ষাৎকারদাতাদের মতামত যে ইউরোপীয় কমিশনের মতামতকেই প্রতিফলিত করে, তা নয়। নিবন্ধটি ভালো লাগলে সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করার কথা বিবেচনা করুন।